করোনা, কোয়ারেন্টিন ও আমাদের পরিচয়


করোনা ভাইরাস বা কোভিড-২০১৯ বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমন একটা সময়ে এই ভাইরাসকে মহামারী ঘোষণা করেছিল যখন এই ভাইরাসের উপস্থিতি চীন ব্যতীত অন্য কোন দেশে খুবই কম ছিল। কিন্তু এটা এত সহজে আর এত দ্রুত পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে তা হয়ত কেউই অনুমান করেননি।


বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগী প্রথম শনাক্ত হওয়ার আগে এবং পরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। ইউরোপিয়ান, দক্ষিণ এশিয়া কিংবা আফ্রিকান দেশ গুলো থেকেও বহু প্রবাসী দেশে ফিরে এসেছেন। দেশে ফিরেই কোয়ারেন্টিনে থাকার যে বিষয়টি ছিল তা মোটেও প্রবাসী কিংবা বাংলাদেশী আপামর জনসাধারণের জন্য সুখকর ছিল না। বেশ তর্ক-বিতর্কও হয়েছে এসব বিষয়ে। এসব তর্ক বিতর্কের পিছনে বহু কারণ আছে। কোয়ারেন্টিনে থাকার জন্য যে সব জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছিল তা অপ্রতুল, অস্বাস্থ্যকর, ভাইরাস ছড়ানোর উৎস কিংবা খাওয়া-দাওয়াসহ নানাবিধ বিষয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল। এসব বির্তকের বাইরে প্রবাসীদের কিছু চিত্র ফুটে উঠেছিল যা মোটেও কাম্য ছিল না। নীচের ঘটনা দুটি এটি স্পষ্ট করবে।
প্রথম চিত্র: চীনের উহান থেকে ৩৬০ জন (প্রায়) দেশে ফিরল এমন একটা সময় যখন সেখানে মৃত্যুর মিছিল চলছিল। আগতদের আকুতির ফলস্বরূপ বাংলাদেশ এবং চীন সরকারের সহায়তায় বিশেষ বিমানে করে তাদের আনা হলো। এসেই তাদের সবাইকে রাখা হলো কোয়ারেন্টাইনে এবং নির্দিষ্ট সময় পর সুস্থ আছেন সনদ পেয়ে ফিরলেন বাড়ি। বিষয়টা তাদের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না কিন্তু তারা নিঃসঙ্কোচে এ কাজটিতে সহায়তা করলেন শুধুমাত্র নিজেদের জন্য নয় বরং পরিবার, স্বজন, সমাজ সর্বোপরি দেশের মানুষের জন্য।
দ্বিতীয় চিত্র: দ্বিতীয় চিত্রটি প্রথম চিত্র থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। ইতালি, জার্মান এবং মিডল ইস্ট থেকে আসলেন কয়েক হাজার মানুষ। তালা ভাঙা হলো, বিক্ষোভ হলো, কোয়ারেন্টাইন অমান্য করে পালালেন। বাড়ি ফিরে তোয়াক্কা করলেন না কোয়ারেন্টাইন মানার নিয়ম। পালিয়ে গেলেন। বিয়ে করলেন, শ্বশুর বাড়ি গেলেন, মাছ বিক্রি শুরু করলেন, বউ নিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরলেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় চিত্রের মধ্যে পার্থক্যঃ
প্রথম চিত্রঃ
যতদুর জানি চীনে বেশির ভাগ বাংলাদেশী যায় এ দেশ থেকে সেখানে উচ্চ শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। দেশের বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Undergraduate programme শেষ করে চীনে গিয়ে Post Graduate করে৷ এ ছাড়া Phd সহ আরও অনেক কিছু। চীনে ওয়ার্কার ভিসা নিয়ে যান এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম বলতে গেলে শূন্যের কোটায় (সুযোগ আছে কিনা জানিনা)। তবে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত আছেন এমন সংখ্যাটা উল্লেখ করার মত। দেশে ফিরে কোয়ারেন্টাইন মানলেন কারণ তারা এ বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারেন যে করোনা ভাইরাস একবার ছড়িয়ে পড়লে তা কতটা মহামারী আকার ধারণ করতে পারে।
দ্বিতীয় চিত্রঃ
এটা সত্য যে ইতালি, জার্মানসহ মিডল ইস্টের বেশিরভাগ দেশে বাংলাদেশিরা যান ওয়ার্কার ভিসা নিয়ে। বলছি না তারা অশিক্ষিত কিংবা অর্ধশিক্ষিত কিন্তু দেশে ফিরে তারা যে পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই ভয়ংকর। করোনা ভাইরাস এমনি একটা সংক্রামক রোগ যা একবার কারো মাধ্যমে ছড়িয়ে গেলে মনের অজান্তেই বহু মানুষের মাঝে ছড়িয়ে মহামারী আকার ধারণ করতে পারে৷ কোয়ারেন্টাইন মানবেন না, নিজেরসহ পরিবার, সমাজ বা দেশের মানুষের কথা
চিন্তা করবেন না শুধু রেমিট্যান্স এর দোহাই দিয়ে যাচ্ছেন। এটা কিসের পরিচয় বহন করছে? কোয়ারেন্টাইন মানছেন না বেশিরভাগ প্রবাসী। তাদের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বিষয়টি রীতিমত আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
প্রবাসে যারা আছেন সবাই এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার, জিডিপির রূপকার। তারা বাহবা পাবার যোগ্যতা রাখেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু নিজের পরিবার, সমাজ এবং দেশের কথা চিন্তা করে কোয়ারেন্টাইন মানা তাদের দায়িত্ব যা বেশিরভাগই ভঙ্গ করেছেন। যাইহোক আল্লাহ আমাদের সবাইকে এটুকু বোঝার তৌফিক দিন যে এটা সংক্রামক রোগ এবং এটা মহামারীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারে।
সবাই বাড়িতে থাকুন। বেচে থাকলে জীবনে অনেক কাজ, আড্ডা বাজি, ঘুরাঘুরিসহ সব কাজ করতে পারবেন। নিজে
সচেতন হোন, অন্যকে সচেতন হতে পরামর্শ ও উৎসাহিত করুন।

Popular Posts